ইরানের এবারের বিক্ষোভ কেন নজিরবিহীন?
- আপডেট সময় : ১১:০৬:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 6
ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে; যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ৪৭ বছরের ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশজুড়ে শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ দমনপীড়ন চালালে বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতায় দাঁড়াতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জবাবে ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সহযোগীদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে। সুতরাং এই বিক্ষোভ এবং এর বিরুদ্ধে ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া আগের গুলোর চেয়ে কতটা আলাদা?
• ইরানজুড়ে ব্যাপকতা
বিশ্লেষকদের বিশ্বাস এবারের বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও তীব্রতার কারণেই এটি আগের গুলোর তুলনায় নজিরবিহীন কিংবা অভূতপূর্ব। সমাজবিজ্ঞানের গবেষক এলি খোরসান্দফার বলেন ইরানের বড় শহরগুলোতে যখন সমাবেশ হচ্ছিল তখন তা ছড়িয়ে পড়ছিল ছোট শহরগুলোতেও, যাদের নাম মানুষ এমনকি আগে শোনেওনি।
ইরান এর আগেও অনেক বিক্ষোভ দেখেছে। নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ করে ২০০৯ সালের কথিত গ্রিন মুভমেন্টে নেতৃত্ব দিয়েছিল মধ্যবিত্তরা। তখন সেটি সীমাবদ্ধ ছিল বড় শহরগুলোতেই। আর ২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন ছিল গরীব এলাকাগুলোতে।
এবারের সাথে তুলনা করার মতো আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল ২০২২ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে মাহশা আমিনের মৃত্যুর ঘটনার পর। হিজাব না পড়ায় দেশটির নৈতিকতা পুলিশ তাকে আটক করেছিল।
• স্বৈরাচার নিপাত যাক
২০২২ সালের বিক্ষোভের মতোই এবারের বিক্ষোভেরও সূত্রপাত হয়েছে একটি ক্ষোভকে কেন্দ্র করে। শেষ পর্যন্ত এটি পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
খোরসান্দফার বলেন, ২০২২ সালের আন্দোলন শুরু হয়েছিল নারীদের একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে। তবে অন্য ক্ষোভও তাতে প্রতিফলিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া আন্দোলনের ইস্যু মনে হচ্ছিল অর্থনৈতিক কিন্তু অল্প সময়েরই মধ্যেই এটি সবার জন্য অভিন্ন দাবিতে রূপ নিয়েছে।
ডলারের সঙ্গে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বিনিময় হারকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাজার ব্যবসায়ীরা তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ধর্মঘট শুরু করে। বিক্ষোভ দ্রুতই দেশটির তুলনামূলক গরীব পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালেও ইলাম ও লোরেস্তান ছিল আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র।
এরপর হাজার হাজার থেকে লাখ লাখ ইরানি এই বিক্ষোভে যোগ দিতে শুরু করে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যারা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করছিল।
মানুষ শ্লোগান দিচ্ছিল স্বৈরাচার নিপাত যাক। এমনকি তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অপসারণ দাবি করেছে।
নির্বাসনে থাকা ইরানি রেজা পাহলভি বিক্ষোভকারীদের প্রভাবিত করছেন মনে হচ্ছে কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এর মানে এই নয় যে বিক্ষোভকারীরা তাকে ক্ষমতায় আনতে চাইছে।
• পাহলভি ফ্যাক্টর
এর আগে ২০২২ সালের আন্দোলনের সময় কোনো নেতৃত্ব চোখে পড়েনি, যে কারণে সেগুলো দ্রুত স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবারের বিক্ষোভে কিছু পরিচিত ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে, যার দূর থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এর মধ্যে একজন হলেন নির্বাসনে থাকা ইরানি নেতা রেজা পাহলভি। তার পিতাকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছিল। এবারের বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হবার আংশিকভাবে এটিও একটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পাহলভি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে থাকার সময় নিজেকে ইরানের শাহ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য তার আহবান ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। দেশটির ভেতরে সামাজিক মাধ্যমে তরুণরা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য পরস্পরকে উৎসাহিত করছে।
তেহরানের মত বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভের মাত্রাই বলে দিচ্ছে পাহলভির আহবান কাজ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিচিত বিরোধী ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি বিক্ষোভকারীদের কাছে এমন বার্তা দিচ্ছে যে সরকারের পতন হওয়ার পরের জন্য একটি বিকল্পও আছে।
অনেকে মনে করেন, পাহলভির প্রতি যে সমর্থনের ছায়া দেখা যায় তা রাজতন্ত্র ফেরানোর ইচ্ছে থেকে নয়, বরং এটি ইসলামী শাসনের বিকল্প হিসেবে কিছুই না পাওয়ার হতাশার বহি:প্রকাশ। বিশেষ করে দেশের ভেতরে স্পষ্ট ও ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী নেতৃত্বের অভাবের কারণে।
• ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের হুমকি
এবারের বিক্ষোভের আরেকটি ফ্যাক্টর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে হোয়াইট হাউজের সমর্থন অনেকটা প্রকাশ্য। ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করে হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা আগে কখনোই হয়নি।
২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সময় শ্লোগান উঠেছিল ওবামা, ওবামা, হয় তাদের সাথে নয়তো আমাদের সাথে থাকো।
ওই আন্দোলনের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন না দেওয়ার জন্য ওবামা পরে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা ইরানের শত্রুদের দ্বারা পরিচালিত। তবে ইস্যু হলো, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ইরানের বন্ধু এখন কম।
ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ উৎখাত হয়ে গেছে। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে দুর্বল হয়েছে লেবাননের হেজবুল্লাহ। সবমিলিয়ে দেশের ভেতরে সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এখন আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির অপসারণের দাবি উঠছে এবারের বিক্ষোভে।
• যুদ্ধের ধারাবাহিকতা
এবার আন্দোলন গড়ে ওঠেছে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার পর। সাংবাদিক আব্বাস আবদি মনে করেন, এই পরিস্থিতি সরকারের জন্য জনগণের মধ্যে কিছু সংহতি তৈরি করার সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি কাজে লাগাতে পারেনি।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, গত বছরের সামরিক আঘাত ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের মর্যাদা ইরানের মানুষের দৃষ্টিতে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
খোরসান্দফার বলছেন, বর্তমান আন্দোলনে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তাহলো রাস্তায় নামা নারীরা বলেছে, তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দমনমূলক সরকারের ভয়কে কাটিয়ে ওঠা। বিবিসি বাংলা।























