চোর ধরার উন্মাদনায় হারিয়ে যায় ‘মনুষ্যত্ব’
- আপডেট সময় : ০৮:৫৭:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / 8
বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেঁধে এক নারীকে নির্মমভাবে পেটানো হচ্ছে। চারপাশে ভিড় করা মানুষদের কেউ মোবাইলে ভিডিও করছেন, কেউ নির্বিকার দাঁড়িয়ে দেখছেন। কেউ মুখে বলছেন, ‘মারবেন না’। কিন্তু সেই অনুরোধেও কেউ থামছেন না। উল্টো লাঠি হাতে থাকা এক বয়স্ক ব্যক্তি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে নিষেধ করা ব্যক্তিকেই মারতে উদ্যত হন। আরেকজন তখনো ওই নারীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে ব্যস্ত। এভাবেই ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে নারীকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এ ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ঘটনাটি রংপুর নগরীর ধাপ এলাকার। গত রোববার (৪ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে কয়েকজন মিলে ওই নারীকে বেধড়ক মারধর করেন। এ ঘটনায় মোখলেছুর রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে এই চিত্র শুধু রংপুরের নয়, এখন সারাদেশেই কমবেশি একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে শাস্তি দেওয়ার নামে উত্তেজিত জনতার মবে কোথাও কোথাও ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনা। বিদায়ী বছরেও দেশজুড়ে শতাধিক জায়গায় কখনো চোর সন্দেহে, কখনো ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিড়ই যেন হয়ে উঠছে ‘বিচারালয়’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- ভিড়ের ভেতরে ঢুকেই সাধারণ মানুষটি কেন মনুষ্যত্ব হারিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে? যে ব্যক্তি কখনো কাউকে মারেনি, হয়তো কখনো আইন ভাঙেনি, সে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ‘হত্যাকারী’ হয়ে যায়?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি-২০২৫ এর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯৭ জন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১২৮। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন একে ‘প্রকট ও প্রাণঘাতী সামাজিক প্রবণতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের হিসাবে- এক বছরের ব্যবধানে গণপিটুনির ঘটনা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য ভাঙা পরিবার ও হারিয়ে যাওয়া জীবন। রংপুরের তারাগঞ্জে গত ৯ আগস্ট ঘটেছিল আরও একটি নৃশংস ঘটনা। মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক করতে গিয়ে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা যান রূপলাল দাস ও তার আত্মীয় প্রদীপ দাস।
সেই দিনের ওই লোমহর্ষক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, সরকার এসব ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় মব সন্ত্রাসে উৎসাহিত হচ্ছে একদল উৎসুক জনতা। নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে বিচার করা এখন সাধারণ ও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
নাটোরে গত বছরের ৩০ আগস্ট রাতে চোর সন্দেহে গ্রামবাসীর পিটুনিতে নবীর আলী নামে একজনের মৃত্যু হয়। নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান জানান, ওই রাতে নেপালদীঘি গ্রামের মাদরাসার মাঠে নবীর আলীর গতিবিধি সন্দেহ হলে তাকে আটক করে এলাকাবাসী। এ সময় চোর সন্দেহে তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে যান তারা।
এরপর গত ১ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গরু চোর সন্দেহে এক রাতে গণপিটুনিতে মারা যান তিনজন। গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানান, রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে নাসিরাবাদ গ্রামে তিনটি গরু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনজন। বিষয়টি টের পেয়ে এলাকাবাসী ধাওয়া করলে তারা প্রাণ বাঁচাতে রাস্তার পাশের একটি পুকুরে লাফ দেন। পরে স্থানীয়রা তাদের ধরে বেধড়ক মারধর করে। এতে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত হন। খবর পেয়ে সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত অবস্থায় আরেকজনকে উদ্ধার করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান।
এছাড়াও গত ২৩ নভেম্বর রাত ২টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দায় রামনগর ইউনিয়নের দেবীনগর গ্রামে ‘চুরি করতে এসেছে’ এমন সন্দেহে গণপিটুনিতে গজগাঁ গ্রামের মোস্তফা হোসেনের ছেলে শাহিনের মৃত্যু হয়।
বিদায়ী বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মব সন্ত্রাসের আরও একটি নিকৃষ্ট উদাহরণের সাক্ষী হয়। ভালুকায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা দীপুকে পিটিয়ে মেরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে ঢাকায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৯ জন এবং কুমিল্লায় ৮ জন নিহত হন। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, রংপুর গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে নিহত হন ৬ জন করে। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে ৫ জন করে এবং নরসিংদী ও যশোরে ৪ জন করে প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। অর্থাৎ যারা সামাজিকভাবে দুর্বল, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

আসক আরও বলছে, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নাগরিকের জীবন ও আইনগত সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। যা এসব ঘটনায় গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়। এ ধরনের ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করছে। যা সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনের শাসনের জন্য হুমকি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মব সন্ত্রাসের ঘটনায় পুলিশের ব্যবস্থা নিতে দেরি করা বা নীরব মানসিকতা এসব ঘটনাকে প্রভাবিত করে।
রংপুর জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, কিছু কিছু স্থানে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সময় দু-একজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তাদের সেখানে কিছু করার সুযোগ থাকে না। কারণ মারমুখী উৎসুক জনতার কাছে তখন কেউই নিরাপদ নয়। এক শ্রেণির মানুষ এটাকে খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করেছে। তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। এমনকি শত শত মানুষের ভিড়ে এমন ঘটনার সময় একজন নিরীহ সহজ সরল মানুষও অতিউৎসাহী হয়ে মবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, এর জন্য আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীদের দ্রুত ছাড় পাওয়ার প্রবণতা দায়ী। প্রত্যেকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। কিন্তু সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখন মাঝেমধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হচ্ছে। যারা এসব করছেন তাদের মধ্যে মানসিক চাপ, ক্ষোভ, হতাশা এবং এক ধরনের উৎসাহ প্রবণ মনোভাব কাজ করে বলে মনে করছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
কেন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বড় একটি কারণ বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের গভীর অনাস্থা। অনেকের বিশ্বাস- পুলিশ ঘুষ ছাড়া কাজ করে না, মামলা মানে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ধরনা দেওয়া। ফলে যখন কাউকে চোর সন্দেহে ধরা হয়, তখন জনতার মাথায় কাজ করে- ‘এখনই শাস্তি না দিলে অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাবে।’
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ক্ষোভ। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, চুরি-ডাকাতির ভয়- এসব মিলিয়ে মানুষের ভেতরে যে ক্ষোভ জমে, তা অনেক সময় বের হয় একজন দুর্বল, সন্দেহভাজন মানুষের ওপর। সেই মানুষটি তখন আর ব্যক্তি থাকে না, সে হয়ে যায় সমাজের রাগের প্রতীক।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতিকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Deindividuation’। অর্থাৎ ভিড়ের মধ্যে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত বিবেক, দায়িত্ব ও পরিচয় হারিয়ে ফেলে। ফরাসি সমাজ ও মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ একে বলেছিলেন ‘collective mind’- যেখানে ব্যক্তি ভিড়ের মানসিকতার অংশ হয়ে যায়। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বার্ডো ‘The Lucifer Effect’ বইয়ে দেখান, ভিড়ের মধ্যে মানুষ এমন কাজও করে, যা সে একা থাকলে কখনো করত না। তখন ব্যক্তির মাথায় শুধু একটি লাইনই ঘুরতে থাকে- ‘আমি না, সবাই করেছে।’
এই সহিংসতাকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আজকাল গণপিটুনি শুধু শাস্তি নয়, হয়ে উঠেছে কনটেন্ট। মানুষ মারধর করতে করতেই মোবাইল ফোনে ভিডিও তোলে, লাইভ করে, শেয়ার দেয়। ভিড় যেন শুধু বিচারই করে না, দর্শকও চায়। তবে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, সহিংসতার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
বিক্ষুব্ধ জনতার হঠাৎ নৃশংস আচরণের পেছনে কারণ ব্যাখ্যা করতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নূর ই আলম সিদ্দিক ঢাকা পোস্টকে বলেন, মানুষ যখন নিজে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে ও অনিরাপদ বোধ করে তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। সেখান থেকেই দলবদ্ধ মানুষ এ ধরনের আচরণ করে থাকে। এটি সামাজিকভাবেও সংক্রমিত হয়। একজন আরেকজনকে দেখে উৎসাহিত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, যারা এ ধরনের সহিংসতা চালায় তারা শাস্তি তো পায়ই না, বরং কখনো কখনো পুরস্কৃতও হয়। ফলে তা দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হয়ে একই পথে হাঁটে।
এ বিষয়ে রংপুরের সাংবাদিক ও সংগঠক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, গত দেড় বছরে যেসব মবের ঘটনা ঘটেছে এর পেছনে কিছু রাজনৈতিক দলের ইন্ধন যেমন রয়েছে, তেমনি এসব ঘটনা শক্তহাতে দমনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও চোখে পড়েছে। যদি শুরু থেকেই সরকার কঠোর হতো, তাহলে অনেক প্রাণ বেঁচে যেত। আমরা রংপুরের তারাগঞ্জে দেখেছি বিদেশি নাগরিককে মবের শিকার হতে। চোর সন্দেহে দুইজনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। কেউ কেউ হয়তো প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু এ ঘটনায় মনে যে দাগ কাটে তা তো সহসা শুকাবে না।
আইন অনুযায়ী চুরির সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদণ্ড। ছিনতাই হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর, ডাকাতি হলে যাবজ্জীবন হতে পারে। কিন্তু ‘ভিড়ের বিচারে’ কোনো আইন নেই, কোনো বিচার নেই- রায় একটাই- মৃত্যু।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী চুরির শাস্তি অপরাধের ধরন ও সহিংসতার মাত্রার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ চুরির ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চুরি বা ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে ৩৯২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। অপরাধ যদি ডাকাতির পর্যায়ে পড়ে, তবে ৩৯৫ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী রিয়াজুর রহমান রায়হান বলেন, আইনের চোখে গণপিটুনির মাধ্যমে কাউকে খুন বা হত্যা করলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। একটা মানুষ যদি জঘন্যতম অপরাধও করে থাকে তবুও তাকে গণপিটুনিতে হত্যা করা যাবে না। দেশের প্রচলিত আইন-আদালত না মেনে বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে হত্যা করলে সেটি দণ্ডবিধি আইনের ৩০২ ধারা মোতাবেক খুনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সহিংসতার এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়- আমরা কি কখনো আইনের ওপর আস্থা আনতে পারবো, নাকি একটি সন্দেহ, গুজব আর উত্তেজিত মুহূর্ত থেকে এভাবেই মানুষ পরিণত হবে লাশে।























