ঢাকা ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেন হঠাৎ স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে বিশ্ব

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৫:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • / 9

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ। ফলে আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যদিও এটি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কিছু জটিলতা রয়েছে।

চলতি বছরে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। গত দেড় বছরে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যার বড় একটি কারণ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা। পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে আবারও সংকটের সময়ে স্বর্ণের গুরুত্ব সামনে এসেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর চীন, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র ও উজবেকিস্তান তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়িয়েছে। এমনকি চীন এক বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে, আর গুয়াতেমালাও কয়েক মাস পর আবার স্বর্ণ কেনা শুরু করেছে।

পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা এখন অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। তাই বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি।

মুদ্রাস্ফীতির সময় স্বর্ণকে মূল্য সংরক্ষণের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় এবং প্রয়োজনে সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল নয় এবং অন্য দেশ সহজে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে না।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ করায় অনেক দেশ বুঝতে পারে, ডলার বা ইউরোর ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত স্বর্ণের মজুত বাড়াতে থাকে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, টানা তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে ১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি স্বর্ণ কিনছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোও দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর তুরস্ক তাদের রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রি বা ব্যবহার করেছে, যাতে তাদের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা যায়। কারণ দুর্বল মুদ্রা আমদানি খরচ বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ায়।

যদিও একসময় স্বর্ণের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল এবং দেশগুলো ডলার বা ইউরোতে রিজার্ভ রাখতেই বেশি আগ্রহী ছিল, এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যদিও স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা আয় আসে না এবং এটি সংরক্ষণে লজিস্টিক সমস্যা রয়েছে, তবুও এটি আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকায় দেশগুলোকে স্বাধীনতা দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ একটি বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তরল সম্পদ, যা অন্য কোনো দেশের দায় নয়। তাই অনেক দেশই এখন তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে স্বর্ণের মজুত বাড়াতে আগ্রহী।

পোল্যান্ড ইতোমধ্যে তাদের স্বর্ণের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। চেক প্রজাতন্ত্রও একই পথে এগোচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বড় করার লক্ষ্য নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে এবং স্বর্ণের বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় ভূমিকা রাখবে।

নতুন প্রজন্মের অনলাইন টিভি

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

কেন হঠাৎ স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে বিশ্ব

আপডেট সময় : ০৫:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ। ফলে আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যদিও এটি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কিছু জটিলতা রয়েছে।

চলতি বছরে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। গত দেড় বছরে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যার বড় একটি কারণ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা। পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে আবারও সংকটের সময়ে স্বর্ণের গুরুত্ব সামনে এসেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর চীন, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র ও উজবেকিস্তান তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়িয়েছে। এমনকি চীন এক বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে, আর গুয়াতেমালাও কয়েক মাস পর আবার স্বর্ণ কেনা শুরু করেছে।

পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা এখন অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। তাই বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি।

মুদ্রাস্ফীতির সময় স্বর্ণকে মূল্য সংরক্ষণের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় এবং প্রয়োজনে সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল নয় এবং অন্য দেশ সহজে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে না।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ করায় অনেক দেশ বুঝতে পারে, ডলার বা ইউরোর ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত স্বর্ণের মজুত বাড়াতে থাকে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, টানা তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে ১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি স্বর্ণ কিনছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোও দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর তুরস্ক তাদের রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রি বা ব্যবহার করেছে, যাতে তাদের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা যায়। কারণ দুর্বল মুদ্রা আমদানি খরচ বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ায়।

যদিও একসময় স্বর্ণের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল এবং দেশগুলো ডলার বা ইউরোতে রিজার্ভ রাখতেই বেশি আগ্রহী ছিল, এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যদিও স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ বা আয় আসে না এবং এটি সংরক্ষণে লজিস্টিক সমস্যা রয়েছে, তবুও এটি আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকায় দেশগুলোকে স্বাধীনতা দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ একটি বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তরল সম্পদ, যা অন্য কোনো দেশের দায় নয়। তাই অনেক দেশই এখন তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে স্বর্ণের মজুত বাড়াতে আগ্রহী।

পোল্যান্ড ইতোমধ্যে তাদের স্বর্ণের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। চেক প্রজাতন্ত্রও একই পথে এগোচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বড় করার লক্ষ্য নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে এবং স্বর্ণের বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় ভূমিকা রাখবে।