শারদীয় দুর্গোৎসব: দেবীর মন ‘তুষ্ট করে’ বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক:ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খধ্বনিতে দেশজুড়ে মন্দির-মণ্ডপে দেবীর আরাধনা ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্যে দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবথেকে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা শুরু হচ্ছে শুক্রবার।

দেবীর আরাধনায় ইতোমধ্যে প্রস্তুত দেশের মোট ৩২ হাজার ৪০৭টি মন্দির ও মণ্ডপ। অশুভ লক্ষণের মধ্যে দিয়ে এবার দেবী দুর্গার আগমন ও প্রস্থান হলেও তাকে তুষ্ট করে বিশ্বশান্তির প্রার্থনা জানাবে হিন্দু সম্প্রদায়। ছড়িয়ে দেওয়া হবে সম্প্রীতির বার্তা। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, গুলশান- বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদ মণ্ডপ, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে মহাসমারোহে ও ব্যাপক আয়োজনে দুর্গা পূজার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রনাথ পোদ্দার জানান, গত বছরের চেয়ে এবার দেশে মোট পূজামণ্ডপ বেড়েছে ২৩৯টি। আর ঢাকায় চারটি বেড়ে এবার ২৪১টি মণ্ডপে পূজা উদযাপনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ ধরায় আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা; বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার এই ‘আগমন ও প্রস্থানের’ মাঝে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত পাঁচ দিন চলে দুর্গোৎসব। চন্দ্রনাথ পোদ্দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পূজার একটা দিক তো আরাধনা বা প্রার্থনা, আবার আরেকটি দিক হল আনন্দ উৎসব। এটা আনন্দটা সার্বজনীন একটা ব্যাপার, শ্বাশত বাঙালি ধর্মীয় সম্প্রীতর মধ্য দিয়ে এই আনন্দ উদযাপন করে। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ পূজার আনন্দ উৎসবে অংশ নেয়। “সেই আনন্দ উৎসবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে। যেখানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে আনন্দ করতে পারে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি যেন বজায় থাকে। আমাদের দিক থেকে সারাদেশের পূজা মণ্ডপে নির্দেশনা দিয়েছি।” পূজা ঘিরে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যেন কোনোরকম সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, তার জন্য সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান চন্দ্রনাথ পোদ্দার। “প্রধানমন্ত্রী সরকারের সব দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানাব, যেন কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে না পারে। সবাই মিলে পূজার আনন্দ উদযাপন করতে চাই।” শারদীয় দুর্গোৎসব: দেবীর মন ‘তুষ্ট করে’ বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা দেবীর বাহন পঞ্জিকামতে, দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যে আসবেন ঘোটকে অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে। যাবেনও ঘোড়ায় চড়ে। এর ফল ‘ছত্রভঙ্গ’। ঘোটকে দেবীর আগমন এবং গমন অশুভের বার্তা দিচ্ছে, তবে ভক্তের আরাধনায় দেবীর মন তুষ্ট হলেই মিলবে শান্তি। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত রাজিব চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেবী কখনও ঘোড়ায় চড়ে, কখনও দোলায়, হাতিতে কিংবা নৌকায় চড়ে আসেন, আবার গমনও করেন। ঘোটকে দেবীর আগমন এবং গমনকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বির্পযয়ের বার্তা থাকে। ২০২৩ সালে দেবী দুর্গার ঘোটকে আগমন এবং গমন, যার ফল ছত্রভঙ্গ।” “ছত্রভঙ্গ মানে রাজনৈতিক হানাহানি, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, অস্বস্তিকর একটা অবস্থা বিরাজমান থাকে। একটা অশুভ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। এবারের আগমন এবং গমন-দুটোই যেহেতু ঘোটকে হবে, ফলে এটা অশুভ লক্ষণ। তবে মায়ের মহিমা তো অপার। কাজেই আরাধনার মাধ্যমে ভক্তরা মায়ের কাছে বিশ্বশান্তি কামনা করবেন। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।” দেবী দুর্গার আগমন বা গমন নির্ভর করে সপ্তমী এবং দশমী তিথি কোন বারে, তার উপর। যেমন সপ্তমী এবং দশমী তিথি রোববার এবং সোমবার হলে গজে/হাতিতে আগমন বা গমন নির্দেশ করে। সপ্তমী এবং দশমী তিথি মঙ্গলবার এবং শনিবার হলে ঘোটকে বা ঘোড়ায় আগমন বা গমন নির্দেশ করে। সপ্তমী তিথি এবং দশমী তিথি বুধবার হলে নৌকায় আগমন বা গমন নির্দেশ করে। সপ্তমী তিথি এবং দশমী তিথি বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার হলে দোলায় আগমন বা গমন নির্দেশ করে। একই বাহনে আগমন এবং গমন অশুভ ইঙ্গিত। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি এক বাণীতে বলেন, “দুর্গাপূজার সাথে মিশে আছে চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আবহমানকাল ধরে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে নানা অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে। “সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাঙালির চিরকালীন ঐতিহ্য। সম্মিলিতভাবে এ ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে হবে আমাদের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায়। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পারস্পরিক ঐক্য, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনে কার্যকর অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্বে মানুষ ও মানবতার জয় হোক- এ প্রত্যাশা করি।” প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, “দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি এখন সর্বজনীন উৎসব। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। “আসুন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ তথা জ্ঞানভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি ।” শারদীয় দুর্গোৎসব: দেবীর মন ‘তুষ্ট করে’ বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা উৎসবের ৫ দিন গেল ১৪ অক্টোবর দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আসার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। শুক্রবার ভোরে হবে বিহিত পূজা, বেলগাছের নিচে ঘট স্থাপন করে ষোড়শ উপাচারে পূজা করা হবে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেবী দুর্গার চরণে গন্ধ, পুষ্প, অর্ঘ্য বাদ্য দিয়ে প্রার্থনা করা হবে। সন্ধ্যাবেলায় শুরু হবে ষষ্ঠ্যাধী কল্পারম্ভ। বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগিয়ে তোলা হবে। পরে অধিবাস ও আমন্ত্রণ করা হবে। এদিন ‘মায়ের’ মুখ উন্মোচিত হয়। লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতীকে নিয়ে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হন দশভূজা দেবী দুর্গা। শনিবার মহাসপ্তমীর সকালে প্রথমে নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। ‘নবপত্রিকা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নয়টি গাছের পাতা। কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান এই নয়টি উদ্ভিদকে পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করা হয়। পরে একজোড়া বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম ‘কলাবউ’। নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে বিবেচনা করা হয়। এই নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে ‘নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমোঃ’ মন্ত্রে পূজিত হন। নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি দর্পণ বা আয়না রেখে সেই দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন উপচারে দেবীকে স্নান করানো হয়। রোববার মহাঅষ্টমী। আর অষ্টমী পূজার মূল আকর্ষণ কুমারী পূজা। এদিন মাকে কুমারীরূপে পূজা করা হয়। ফুল, জল, বেলপাতা, ধূপ-দীপসহ ষোড়শ উপচারে মায়ের পূজা করা হয়। ঢাকার মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশনেই শুধু কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কুমারী পূজায় মাতৃরূপে দেবী দুর্গারই আরাধনা করা হয়। সোমবার মহানবমী। এদিন সকালে তর্পণে মায়ের মহাস্নান হবে, ষোড়শ উপচারে পূজা করা হবে। পুষ্প, অর্ঘ্য নিবেদন শেষে মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন ভক্তরা। কোনো কোনো মণ্ডপে নবমীতে যজ্ঞের আয়োজন হয়। মহানবমীতে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে ভক্তদের হৃদয়। মঙ্গলবার মহাদশমী। সকালে বিজয়া দশমীতে ‘বিহিত পূজা’ আর ‘দর্পণ বিসর্জনে’ দুর্গা পূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি হয়। বিকালে হয় প্রতিমা বিসর্জন। পরে শান্তিজল গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসবের। রাজধানীতে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে দশমীর বিকালে পলাশী মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা হবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির হয়ে পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাই কোর্ট, বঙ্গবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ভবন, গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্থান মোড়, নবাবপুর রোড, রায় সাহেব বাজার, বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজ ঘাটে হবে বিভিন্ন পূজা মণ্ডপের প্রতিমা নিরঞ্জন। বিজয়া দশমীতে একদিকে আনন্দময়ী মাকে বিদায় জানানোর পালা, আবার আসন্ন বছর ‘মা’ আবার আসবেন সেই অপেক্ষার শুরু।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Title