সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতাঃ
একবার আমাদের গ্রামে হৈচৈ পড়ে গেল। হৈচৈর কারণ- ‘বাঘ’। গ্রামে বাঘ ঢুকেছে। আর এই বাঘকে সামনাসামনি দেখার বিরল সুযোগ লাভ করেছে আমাদের গ্রামেরই বড়ভাই টাইপের দুজন। যেহেতু তারা বড়ভাই টাইপের, অতএব তাদের কথা অবিশ্বাস করার দুঃসাহস কেউ দেখাল না। হুজুগে পড়ে সবাই হৈচৈ-মাত্রা বাড়িয়ে দিল। রাত তখন হয়তো ৮টা-৯টা বাজে। বড় ভাইদ্বয় এসে খবর দিল খালের পাড়ে বাঘ শুয়ে আছে। খবর পেয়ে আমাদের গ্রাম আর আশপাশের গ্রামের সবাই গেল সেখানে। খালের পাড়ে তখন কিছু একটা শুয়ে আছে। তবে অন্ধকারে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। বড় ভাইদ্বয় বলল টর্চ মারলে বাঘেরা ক্ষেপে গিয়ে আক্রমণ করতে পারে, তাই কেউ টর্চ মারল না। সারা রাত লাঠিসোঁটা নিয়ে জায়গাটা ঘিরে রাখল। সকাল হলেই বাঘটা ধরবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে। টিভি ক্যামেরা চলে আসবে সময়মতো। খবর দেওয়া আছে। অতঃপর যখন সকাল হলো, সবার মাথায় যেন ঠাটা আই মিন বাজ পড়ল। বড় ভাইদ্বয়ের কথায় তারা বাঘ মনে করে যে জিনিসটাকে সারা রাত পাহারা দিয়েছে, সেটা বড় সাইজের একটা হুঁলো বিড়াল। কার বাড়ি থেকে যেন পাতিল ভর্তি মাংস চুরি করে খেয়ে পেট ফুলিয়ে আরামে ঘুম দিয়েছে।
তো মোর্যাল অফ দ্য স্টোরি হচ্ছে, চতকদারি রমরমা কথা বা বিজ্ঞাপনের চাপে আমাদের প্রত্যাশা যত আকাশচুম্বিই হোক না কেন, শেষমেশ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বিরাট বড় একটা গোল্লা। ঠিক তেমনই ঘটে আসছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বেসরকারী স্কুল সোনারগাঁও স্টার ফ্লাওয়ার এসআর স্কুল এন্ড কলেজের ক্ষেত্রে। গত এক বছরে বিভিন্ন অনিয়মের স্বাক্ষী হয়ে প্রধান শিক্ষকসহ ১৮জন শিক্ষক চলে গেলেও রমরমা ব্যবস্যা করার জন্য চটকদারি বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করেই চলছে স্কুল কর্তৃপক্ষ দুই রাঘব বোয়াল প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহ আলী ও রফিকুল ইসলাম।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কলঙ্ক লেগেই ছিলো। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহ আলী ও রফিকুল ইসলাম তাদের নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনদের চাকরী দেয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়। যার কারণে মাহবুবুর রহমান (শিক্ষার্থীরা যাকে ব্যঙ্গ করে ‘শিক্ষা বাবা’ বলে) নামে একজন অধ্যক্ষ নিয়োগ পায় যে ছিলো একজন ধান্দাবাজ। টাকা খেয়ে এমন লোক নিয়োগ দেয়াতে সে অনেক অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাত করে পালিয়েছে সেটা এখন সকলেই জানে।
প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ডক্টর আহসান কবির চৌধুরী জানান, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহ আলী ও রফিকুল ইসলাম স্কুলটি মূলত পরিচালনা করেন তাদেরই ভাগিনা ও ভাগনিদের নিয়ে গঠিত একটি ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের গোন্ডা বাহিনী দিয়ে। তারা যা বলে তাই করতে বাধ্য করা হয় প্রিন্সিপাল সহ অন্যান্য শিক্ষকদের অন্যথায় অপমান অপদস্ত করা রীতি চলমান আছে স্কুলটিতে। মাত্র ৬ মাস চাকরীর সময়ে ঐ স্কুলের এমন সব অনৈতিক ও শিক্ষার মান নষ্ট করার নয় দূর্নীতির স্বাক্ষী হয়ে আমি ও স্বইচ্ছায় চাকরী ছেড়ে চলে আসি। আসার পরও তাদের অপমান আমার পিছু ছাড়েনি।
তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহ আলী ব্যবসায়িক স্বার্থ হাছিল করতে সোনারগাঁ উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অন্য উপজেলায় নিয়ে পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মূলত বন্দরের ঐ স্কুল কর্তৃপক্ষকেও তিনি অর্থের বিনিময়ে নিজের দলে ভীরিয়ে নেন। যেন তার স্কুলের সকল শিক্ষার্থী পরীক্ষায় নৈতিক সুবিধা ভোগ করতে পারে।
এমনও অভিযোগ পাওয়া যায় যে, এই স্কুলে অনেক শিক্ষকের শিক্ষকতা করার মতো উপযুক্ত সনদও নাই। আরেকটি চিরন্তন সত্য কথা যা তা হলো এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বেশিদিন টেকে না। এখান থেকে চলে যাওয়া অনেক শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় যে, স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রাটা এমন হয়েছে যে রফিকুলের তুলনায় শাহ আলী স্কুলে ক্ষমতা দেখায় বেশি। যার কারণে স্কুলে রফিকুলের তুলনায় শাহ আলীর আত্মীয়-স্বজন বেশি চাকুরী করে। শুধু তাই নয়, শাহ আলী স্কুলে এক প্রকার একনায়কতন্ত্র চালু করে সপ্তাহ যেতে না যেতেই স্কুলে মিটিং-এর আয়োজন করে শিক্ষক-কর্মচারীদের নানারকম গালিগালাজ ও মেন্টাল প্যারা দিতেন বলে চলে যাওয়া অনেক শিক্ষকই মন্তব্য করেন। শাহ আলী ও রফিকের দুর্নীতির মাত্রাটা এমন পর্যায়ে আসে যে, সম্প্রতি সরকারী নির্দেশ তোয়াক্কা না করে বাড়ি বাড়ি পরীক্ষা নেয়া এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টিউশন ফি নেওয়া হয়। অথচ উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক শিক্ষককে বেতন দেয়া হতো না। বেতন না দেয়ার প্রতিবাদ করলে শিক্ষকদের অপমান করে চলে যেতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সেই স্কুলে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় যে, এই করোনা মহামারীতে কোনো প্রকার ছাড় না দিয়ে সম্পূর্ণ টিউশন ফি আদায় করে তারা। এমনকি বাসায় বাসায় শিক্ষকদের মাধ্যমে রশিদ দিয়ে টাকা উত্তোলনের অভিযোগও পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক শিক্ষক ছিলেন যারা এখানে এই করোনা পরিস্থিতে ঘর ভাড়াও ঠিক মতো না দিতে পেরে বেতন চাওয়াতে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে। এছাড়াও একজন গর্ভবতী শিক্ষককেও তারা এই করোনাকালীন সময়ে বেতন দেয়নি বলে জানা যায়। এই করোনা মহামারীতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা স্বত্ত্বেও তারা ক্লাস শুরু দিয়েছিলো। পরে স্থানীয় একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধির হস্তক্ষেপে তারা সেই ক্লাস বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
Facebook Comments Box
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
কেক কাটার সময় যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৪ নেতাকর্মী আটক
১
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট