Ritesh Beghi
৩০ মে ২০২৬, ১:৩২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বার্ধক্য ঠেকাতে ২৬ বিলিয়ন ডলারের তহবিল বরাদ্দ দিলেন পুতিন, কী আছে প্রকল্পে

মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব—গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এমন একটি ঘরোয়া আলাপচারিতা ফাঁস হয়ে যায়। সে সময় অনেকে এটিকে দুই বয়োবৃদ্ধ শাসকের খেয়ালি গল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এটি কেবল সাধারণ আড্ডা ছিল না। পুতিন মূলত ক্রেমলিন-সমর্থিত দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্যরোধ-সংক্রান্ত একটি উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের বিবরণ দিচ্ছিলেন, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ বা প্রধান বিজ্ঞান প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

সিলিকন ভ্যালির ধনকুবের জেফ বেজোস বা স্যাম অল্টম্যানদের মতো পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যরোধ গবেষণার প্রতি আগ্রহী। তবে রাশিয়ায় পুতিনের এই আকাঙ্ক্ষা এখন একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। এই প্রকল্পের আওতায় থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং (অঙ্গ মুদ্রণ), বিশেষ জাতের শূকরের শরীরে মানুষের অঙ্গ তৈরি এবং মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় কোল্ড থেরাপির মতো অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত মাসে রাশিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, পুতিনের ২৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০০ কোটি) ডলারের ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীরগতির করার জন্য একটি জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন।

রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি গত ২৩ এপ্রিল বলেন, কোষের বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ওষুধ অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল একটি মাধ্যম হতে যাচ্ছে।

এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো—গবেষণাগারে প্রতিস্থাপনের জন্য মানুষের কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা। ২০২৪ সালে উন্মোচিত এই জাতীয় দীর্ঘায়ু প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দশকের শেষ নাগাদ (২০৩০ সালের মধ্যে) ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সংখ্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ সেনাদের আনুমানিক সংখ্যার এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।

পুতিন কর্তৃক নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন:

১. বায়োপ্রিন্টিং: জীবন্ত টিস্যুর থ্রিডি প্রিন্ট করা।

২. জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন: জিনগতভাবে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ জাতের ছোট শূকরের শরীরের ভেতরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করা।

ইতোমধ্যে রুশ বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের তরুণাস্থি বায়োপ্রিন্ট করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্রেমলিনের প্রেস সার্ভিস এক ই-মেইল বার্তায় জানিয়েছে, রাশিয়ান ফেডারেশনে এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির একটি সম্পূর্ণ পরিসরের কাজ চলছে। এই প্রকল্পগুলো রাষ্ট্র দ্বারা সমর্থিত এবং বহু বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে।

পুতিনের এই দীর্ঘায়ু অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি। একজন হলেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরোনৎসোভা, যিনি একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ। তিনি এই জিনপ্রযুক্তি কর্মসূচির তদারকি করছেন। অন্যজন হলেন বিতর্কিত পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক। তিনি সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান।

কোভালচুক রাশিয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন, তবে মানুষকে মেরামত করার সক্ষমতা যে সামনে নিঃসন্দেহে বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

জেফ বেজোস বা পিটার থিয়েলের অর্থায়নে পরিচালিত পশ্চিমা গবেষণার মতো ক্রেমলিনের এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।

রাশিয়ায় বায়োপ্রিন্টিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি, যিনি ইউক্রেন আক্রমণের পর দেশ ছেড়েছেন, তিনি বলেন, যদি কোনো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা না থাকে, তবে বুঝতে হবে, সেখানে বাস্তবসম্মত কোনো ফলাফল নেই। এগুলোকে ফলাফলের চেয়ে স্বপ্ন বলাই ভালো। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁরা সম্ভবত পুতিনকে তা-ই শোনাচ্ছেন, যা তিনি শুনতে চান, যাতে কোটি কোটি ডলারের তহবিল বরাদ্দ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া বিজ্ঞানী কোভালচুক এই বিজ্ঞানকে ক্রেমলিনের ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের মাধ্যমে এমন একধরনের ‘সেবক বা দাস মানব’ তৈরির চেষ্টা করছে, যাদের নিজস্ব চেতনা থাকবে না।

বার্ধক্যকে জয় করার এই আকাঙ্ক্ষা রুশ শাসকদের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বোগদানভ রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারুণ্য ধরে রাখার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, যদিও পরে নিজের শরীরের ওপর পরীক্ষা করতে গিয়ে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৩০-এর দশকে জোসেফ স্তালিনের প্রশংসাধন্য চিকিৎসক ওলেকসান্দর বোগোমলেটস দাবি করেছিলেন, মানুষ ১৫০ বছর বাঁচতে পারে, যদিও তিনি নিজে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। পুতিনের ‘ব্যক্তিগত জেরন্টোলজিস্ট’খ্যাত ভ্লাদিমির খাভিনসন দাবি করেছিলেন, মানুষ ১২০ বছর বাঁচবে, তিনিও ২০২৪ সালে ৭৭ বছর বয়সে মারা গেছেন।

৭৩ বছর বয়সি পুতিন দীর্ঘদিন ধরে নিজের শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শন করে আসছেন। কখনো খালি গায়ে শিকার করে, কখনো বরফশীতল পানিতে ডুব দিয়ে তিনি নিজের ‘চিরতরুণ’ ইমেজ ধরে রাখতে চান। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, বর্তমানে উন্নত বিশ্বের তুলনায় রাশিয়ার গড় আয়ু বেশ কম। রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু মাত্র ৬৮ বছর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ৭৬ বছর এবং পশ্চিম ইউরোপে ৮০ বছরের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনের জন্য রাশিয়ার সাধারণ নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, জীববিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম অর্থাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবত ততটাই কঠিন।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার ও জনসভা নিষিদ্ধ

নাঙ্গলকোট বিএনপিতে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ

বিরোধীদলীয় নেতাকে দেড়শ টাকার দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৬%

অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

ডেঙ্গু নিয়ে সবাইকে সতর্ক করলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল

আগের সরকারের ১৩০০ প্রকল্পের অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে : অর্থমন্ত্রী

বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে পুঁজিবাজার: বিএসইসি চেয়ারম্যান

১০

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ : জাতিসংঘ

১১

সালাম তালুকদারের রাজনীতি ছিল কেবলই মানুষের জন্য: স্মরণসভায় বক্তারা

১২

ঢাকায় যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটি

১৩

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান

১৪

খার্গ দ্বীপ ‘উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে’ দাবি ট্রাম্পের, সঙ্গে দেওয়া ভিডিওটি এআই!

১৫

মুম্বাই বিমানবন্দরে ১১ কোটি রুপির স্বর্ণ পাচার, ৫ বাংলাদেশিসহ গ্রেফতার ৬

১৬

আরও বোয়িং কিনবে বাংলাদেশ, চুক্তিকে ‘অসাধারণ’ বললেন সার্জিও গোর

১৭

দেশে স্বর্ণের দামে ফের বড় পতন

১৮

দুই মিনিটের ব্যবধানে দু’বার ভূমিকম্পে কাঁপল কোস্টারিকা

১৯

কফি উইথ করণে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সালমান, অতিথির তালিকায় আর কে?

২০