Ritesh Beghi
৮ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৫২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যুদ্ধ যেভাবে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে চালকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে

প্রায় ৪০ দিন ধরে যুদ্ধ চলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। কিন্তু ইরান এখানে মাথা নত করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল ভেবেছিলেন। সেই হিসাব এখন উল্টে গেছে। শেষমেশ নিজেই ইরানের ১০ দফায় সম্মত হয়ে পিছু হটেছেন।

ট্রাম্প একসময় ইরানিদের বলেছিলেন, তাদের সরকার ‘তাদের নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য’। এখন সেই একই মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন ইরানকে ‘পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’। এই পরিবর্তন অনেক কিছু বলে দেয়।

হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্প হাজার হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়া। কিন্তু এখন মার্কিন নৌবহর নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। ইরান নিজেই ঠিক করছে কোন জাহাজ যাবে আর কোনটা যাবে না। প্রতিটি জাহাজকে এখন ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত চাইনিজ ইউয়ানে টোল দিতে হচ্ছে।

ইসরায়েলি সেনাপ্রধান এয়াল জামির এক মাস আগে দাবি করেছিলেন, ইরানের ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু এখন নিয়মিত মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৩ হাজারেরও বেশি বিমান হামলার পরও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে।

ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো ইরান ভেঙে পড়েনি। সেই দেশগুলোতে নেতা পালালেই বা মারা গেলেই সরকার ধসে পড়েছিল। কিন্তু ইরানের ব্যবস্থা আলাদা। মোসাদ ও সিআইএর অনুপ্রবেশ এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পরেও ইরানের কমান্ড ব্যবস্থা অটুট আছে। মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নেয়া এ বছরের শুরুতে ইরানকে ‘সহজ লক্ষ্য’ মনে করেছিলেন। সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

ইরানের জনগণের ভেতরেও দ্বন্দ্ব আছে। একদিকে জানুয়ারির বিক্ষোভের স্মৃতি, অন্যদিকে ট্রাম্পের হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। কিন্তু বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ক্রোধটাই এখন বড় হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিরোধ মানুষকে উজ্জীবিত করছে।

এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়ায় গত সপ্তাহে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। দামেস্ক থেকে শুরু করে আলেপ্পো, হোমস, ইদলিব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ। আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সিরীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে স্লোগান দিয়েছে। জর্ডানেও ক্ষোভ বাড়ছে। আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয়েছে। একজন জর্ডানীয় সাংবাদিক আলী ইউনেস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘জর্ডানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ইরানকে সমর্থন করছে, যদিও গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে তা বলতে পারছে না।’

মিশরীয় বিশ্লেষক মামুন ফান্দি বলেছেন, ‘ইসরায়েল আবার আরবদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এমনকি মিসর, জর্ডান এবং আমার মতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনেও — যারা শান্তিচুক্তি করেছিল। ইসরায়েল এখন পুরোপুরি আরব শত্রুর তালিকায়। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে শান্তির ধারণাটা এখন একটা হ্যালুসিনেশন।’

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্পের হামলা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর একটি অস্ত্র দিয়ে দিয়েছে। সেটা হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ।

এই পরিস্থিতিতে শান্তির প্রস্তাবও ব্যর্থ হচ্ছে। পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ও প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমা এবং হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হচ্ছে। ইরানের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাইদ হাদাদিয়ান বলেছেন, ‘আপনি আবোল-তাবোল বকছেন এবং ইসলামিক রিপাবলিকের ব্যাপারে ওষুধ দেওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই। তিন দিনের মধ্যে আপনার মন্তব্য প্রত্যাহার করুন এবং ক্ষমা চান।’

বিশ্লেষক মোহাম্মদ এসলামি ও জেইনাব মালাকুতি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প মনে করছেন তেহরান হরমুজকে যুদ্ধবিরতি বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই ধারণা ভুল হতে পারে। ইরান হরমুজকে যুদ্ধ শেষ করার হাতিয়ার নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে বলে মনে হচ্ছে।’

উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্পকে ইরান আক্রমণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিল। কিন্তু তারপরেও তাদের তেল ও গ্যাস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হোটেল ও বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। ট্রাম্প ও তার পরিবারের পেছনে বিনিয়োগ করা কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে তারা কিছুই পাননি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ শেষে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। ট্রাম্প ‘বিজয়’ ঘোষণা করে চলে গেলেও ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। আর মিসরীয় বিপ্লবের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ এলবারাদেই বলেছেন, আরব বসন্ত মরে যায়নি, ঘুমিয়ে আছে। দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, অবিচার ও দুর্নীতির বাস্তবতা এখন আগের চেয়েও বেশি স্পষ্ট।

নেতানিয়াহু সারাজীবন ইরান আক্রমণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হতে গিয়ে আরব ও ইরানিদের, ধনী ও গরিব, সুন্নি ও শিয়া সবাইকে এক কাতারে এনে দিয়েছে।

সূত্র- মিডল ইস্ট আই

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ন্যাটোর আদলে সক্রিয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি

১

জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

২

চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে ৪ নতুন বই

৩

গ্যাসের সন্ধান মিলল নতুন কূপে, জ্বালানি খাতে সুখবর

৪

পুলিশ ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৫

স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার ও জনসভা নিষিদ্ধ

৬

নাঙ্গলকোট বিএনপিতে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ

৭

বিরোধীদলীয় নেতাকে দেড়শ টাকার দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

৮

আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৬%

৯

অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

১০

ডেঙ্গু নিয়ে সবাইকে সতর্ক করলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

১১

চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল

১২

আগের সরকারের ১৩০০ প্রকল্পের অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে : অর্থমন্ত্রী

১৩

বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

১৪

এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে পুঁজিবাজার: বিএসইসি চেয়ারম্যান

১৫

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ : জাতিসংঘ

১৬

সালাম তালুকদারের রাজনীতি ছিল কেবলই মানুষের জন্য: স্মরণসভায় বক্তারা

১৭

ঢাকায় যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটি

১৮

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের রুনা খান

১৯

খার্গ দ্বীপ ‘উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে’ দাবি ট্রাম্পের, সঙ্গে দেওয়া ভিডিওটি এআই!

২০