সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সরকার গঠনের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও সেই বৈঠকে জামায়তের আমির সুনির্দিষ্ট কোনো সরকার কাঠামোর কথা বলেননি।
বিএনপি-জামায়াত কি জাতীয় সরকার গঠন করবে?
- আপডেট সময় : ০৭:০৪:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / 9
এই বক্তব্যকে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, জামায়াত নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয়কে আলোচনায় রাখতে চাইছে বলে তাদের ধারণা।
কেন এত আলোচনা
তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বৈঠকটি ছিল ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর একদিন পর ১ জানুয়ারি দলটির গুলশানের কার্যালয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে গিয়েছিলেন শফিকুর রহমান। সে সময়ই জামায়াত নেতা বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে।
জামায়াত নেতা তার এই বক্তব্যে নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেননি।
কিন্তু তিনি বলেছেন, নির্বাচনের পরে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার করার বার্তা দিয়েছি।
এর কারণ ব্যাখ্যায় শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে দেশের অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব ক্ষেত্রই ভেঙে পড়েছে। সেই পরিস্থিতি এখনো সামাল দেওয়া যায়নি। সেখানে ঐকমত্য ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো দলের এককভাবে দেশ চালানো বেশ কঠিন বা চ্যালেঞ্জের। আর সেই বিবেচনা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সব দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন বলে জামায়াত মনে করছে।
তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর যে সম্পর্ক এখন প্রকাশ্য বা দৃশ্যমান, তাতে টানাপেড়েন বা এক ধরনের বৈরিতাও দেখা যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর বিএনপির পুরনো মিত্র জামায়াতই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। দল দুটির নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দল দুটি নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই শিবিরের।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ যদিও বলছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যেহেতু একটা বড় দল আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা রাজনীতিতে অনুপস্থিত। সেই শূন্যতায় নির্বাচনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ দেখানো বা তৈরি করাও সক্রিয় দলগুলোর লক্ষ্য হতে পারে।
কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনের সময়ই সেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপেড়েন প্রকাশ্যে আসে। তখন বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে সঙ্গে রাখেনি। জামায়াত আলাদাভাবে আন্দোলন করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের অনেকে আবার মনে করেন, নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের টানাপেড়েন তৈরি হয়েছে কয়েক বছর আগে; যা এখন বেড়েছে।
ফলে বিএনপি বা জামায়াত, যে দলই নির্বাচনে জয়ী হোক—তারা একে অপরের সরকারে অংশীদার হবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের অনেকের। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সক্রিয় সব দলই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তাদের প্রভাব আছে বলে মনে করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা ফলও পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সঙ্গে থাকার আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে।
লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াত ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চায়। সেকারণে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চেয়েছে।
যদিও জামায়াত নেতারা এ বক্তব্য মানতে রাজি নন। তারা যেই সরকার গঠন করুক, সেই সরকারের সব দলের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।
জামায়াত কি বিএনপির সঙ্গে সরকারে থাকতে চায়?
নির্বাচনের পরে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে জামায়াত। এটি তাদের দলের প্রস্তাব। তবে দলটির আমির জানিয়েছেন, তাদের তিনটি শর্ত আছে। প্রথমত, দুর্নীতিকে কোনোভাবে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না; দমনে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকার বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় যে সব সংস্কার প্রস্তাবে সব দল একমত হয়েছে, সেগুলো কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
জামায়াত যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে এই তিন শর্তে যারা সম্মত থাকবে তাদের নিয়ে দলটি জাতীয় সরকার গঠন করবে। জামায়াতের আমিরের বক্তব্য হচ্ছে, কোনো সরকারে গিয়ে সেই সরকারের দুর্নীতির দায় নিতে রাজি নন তারা।
তার এই বক্তব্য বিএনপির দিকেই ইঙ্গিত করে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। তারা বলছেন, বিএনপিকে বাদ রাখার চিন্তা থেকেই জামায়াত তিনটি শর্তের কথা বলছে। তবে সরকার গঠনের আগে বিএনপি নেতার সঙ্গে আলোচনা চেয়ে জামায়াত নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে দলটি বিএনপির সঙ্গে সরকারে যেতে চায় কি না, সেই প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতকে বাদ দিয়েই বিএনপি ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলে আসছে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় সবদলের ঐকমত্য ও সহযোগিতার বিষয় তারা সামনে আনছেন।
জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারা জাতীয় সরকারের প্রস্তাব নিয়ে এগোবে। আর বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে সেই সরকারে তারা সহযোগিতা করতে চায়।
ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ যে ১০টি দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনের আসন সমঝোতা করছে, সেই দলগুলোও তিন শর্তে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের পক্ষে রয়েছে।
এছাড়া এই দলগুলোর কোনো কোনো দল অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব তুলেছিল। বিএনপি ও এর মিত্ররা রাজি না হওয়ায় তখন দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সরকারগঠন করা হয়নি বলে একাধিক রাজনীতিক জানিয়েছেন।
বিএনপির ও জামায়াতের প্রস্তাবের যোগসূত্র আছে কি?
যোগসূত্রের প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে। কিন্তু দল দুটির নেতারা কোনো যোগসূত্র থাকার বিষয় স্বীকার করছেন না। দুই দলের প্রস্তাবে অবশ্য পার্থক্য আছে। জামায়াত জাতীয় সরকার গঠন করতে চায়। আর বিএনপি বলে আসছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা। দলটি আওয়ামী লীগের শাসনের সময়ই ২০২২ সালে সেই সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাবে বিএনপি তাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলেছে। সেখানে জামায়াতকে বাদ রেখেই ওই প্রস্তাব দিয়েছিল তারা।
এখন নতুন করে নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাদের প্রস্তাব ছিল জামায়াতকে বাদ রেখে মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠন করা। সেই অবস্থানেই তারা আছেন। ভোটে জয়ী হলে তারা তাদের প্রস্তাব অনুযায়ীই সরকার গঠন করবেন।
বিএনপির আরেকজন প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, সব দল মিলে সরকার গঠন করলে তখন সংসদে বিরোধী দলে কেউ থাকবে না। আওয়ামী লীগের শাসনের মতই একপক্ষীয় সংসদ হবে।
এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেছে বিএনপি। দলটি দেশ পরিচালনায় সহযোগিতা করা এবং ক্ষমতার অংশীদার, দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখতে চাইছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি কোনো অভিযোগ তোলার সুযোগ দিতে চায় না বলে মনে হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত ঐকমত্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আছে?
দল দুটির প্রকাশ্য অবস্থান থেকে সে ধরনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তাদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা বলছে।
নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি ও এবি পার্টিসহ ১০টি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে আলাদা একটি শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে জামায়াত। তারা শর্তসাপেক্ষে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে। দুই শিবিরের নেতৃত্ব দেওয়া দুই দলও একে অপরকে বাদ রেখেই সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে, নির্বাচন এগিয়ে এলে তাদের সম্পর্কের টানাপেড়েন আরো বাড়তে পারে বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কোন ধরনের হতে পারে, সেটা নির্বাচনের ফলাফল ও বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে।























