Ritesh Beghi
২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৭:৪২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

‘বৃদ্ধাশ্রমে ইফতার আসে, কিন্তু সন্তানেরা আসে না’

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ছোট্ট এক আশ্রমের বারান্দা রমজানের বিকেলে ভরে ওঠে ইফতারের সাজসজ্জায়। ফল, পিয়াজু, ছোলা, শরবতসহ নানা খাবার পৌঁছে যায় ব্যক্তি উদ্যোগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। তবে এই আশ্রম ওল্ড অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হোমের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভাব সন্তানদের উপস্থিতি। আশ্রমটি নিজ খরচে পরিচালনা করছেন পল্লী চিকিৎসক ডাক্তার সেবিন।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আশ্রমের প্রাঙ্গণ ছিল ব্যস্ত। কেউ রান্নাঘরে সাহায্য করছিলেন, কেউ নীরবে বসে ছিলেন। উঠানে কয়েকজন লুডু খেলায় মেতে উঠেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি এক বড় পরিবার। তবে হৃদয়ের ভেতরে জমে থাকা শূন্যতা প্রকাশ পায় না।

বারান্দার এক কোণে বসে ছিলেন বেলি খাতুন (৫৮)। চোখে মুখে ঝরে থাকা দীর্ঘশ্বাস, কণ্ঠে চাপা বেদনা। তিনি বলেন, এমন সন্তান যেন কারো ঘরে না হয়। বেলি খাতুনের কথায় ফুটে ওঠে এক জীবনের ভাঙা স্বপ্ন। তিনি তার সন্তানদের জন্য জীবনের সমস্ত অর্জন উৎসর্গ করেছিলেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো স্নেহময় স্পর্শ পাননি।

৫৫ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী গোলাপি বেগম বলেন, আমি এখানে দুই বছর ধরে আছি। স্বামী নেই, সন্তান নেই। এখানে সবাই একে অপরকে সহমর্মিতা দেখাই। কেউ খোঁজ নেয় না, তবু আশ্রম আমাকে পৃথিবীর এক উষ্ণ কোণে রাখেছে। মৃত্যু হলে এখানেই হোক।

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, যারা এখানে আসেন, তারা কেউ অপরাধী নয়। জীবন দিয়ে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন, কিন্তু অবহেলার কারণে আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের উচিত তাদের প্রতি যত্ন ও ভালোবাসা দেখানো। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা যেত।

দুই বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই নিবাসে বর্তমানে ১৮ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং তাদের দাফন করা হয়েছে আশ্রম সংলগ্ন নিজস্ব কবরস্থানে। এখানে থাকা প্রবীণদের অধিকাংশই একসময় শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত জীবনযাপন করেছেন। সন্তান বা পরিবারের কাছ থেকে আঘাত বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তারা আশ্রয় নিয়েছেন।

আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক, পল্লী চিকিৎসক ডা. সেবিন বলেন, এখানে আসা প্রবীণরা ভিক্ষা চান না। তারা চাই সম্মান এবং সামান্য স্নেহের স্পর্শ। আমরা তাদের তিনবেলা খাবার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দিই। রমজান মাসে প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ ইফতার পাঠান। কিন্তু সন্তানদের উপস্থিতি খুবই কম, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমার একার পক্ষে পরিচালনা করা কঠিন। তবে সরকারি বা সমাজের বিত্তবান একটু সহযোগিতা করলে আমরা ২৫০ জনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব।

তবে ইফতারের সময় সবাই একসাথে বসে। খাবার আছে, হাসি আনন্দ আছে, কথোপকথনও আছে। কিন্তু চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ, নীরব শূন্যতা। এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি সন্ধ্যা শুধুই ইফতারের আয়োজন নয়, এটি প্রবীণ মানুষের নীরব অপেক্ষার গল্প, যেখানে সন্তানরা আসে না। রমজানের এই রাতে বারান্দা যেন প্রশ্ন রাখে- বৃদ্ধ বয়সে বাবা মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া কি শুধুই খাবার, নাকি একটু ভালোবাসা, একটি স্পর্শ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কেক কাটার সময় যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৪ নেতাকর্মী আটক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

ড্রোন হামলার ধাক্কা কাটিয়ে এলএনজি উৎপাদনে ফিরছে কাতার

মেসি প্রশ্নে বিরক্ত রোনালদো বললেন, ‘পছন্দ না হলে উত্তর দেব না’

নিষিদ্ধ হলেন মুখ ঢেকে কথা বলে লাল কার্ড দেখা সেই ফুটবলার

নকআউট পর্ব নিশ্চিত করল কলম্বিয়া

মেসিকে বিয়ে করতে চাওয়া কে এই ১০০ বছর বয়সি ভক্ত

চূড়ান্ত চুক্তিতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের নিষেধাজ্ঞা ছাড় পেতে পারে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনার সফলতা কামনা প্রতিমন্ত্রীর

নকআউটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে, স্পেন-কেপ ভার্দে নাকি সৌদি আরব?

১০

বেন গাভির একজন যুদ্ধাপরাধী, ইসরাইলকে কোনো মার্কিন সহায়তা দেওয়া উচিত নয়: বার্নি স্যান্ডার্স

১১

পেনাল্টিটা হলে হয়তো পরের দুই গোল পেতাম না: মেসি

১২

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে পতন

১৩

ধানমন্ডি ৩২-এ জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল

১৪

মেসি তো সবসময় গোল করে, আগেও করেছে ভবিষ্যতেও করবে: এমবাপ্পে

১৫

রেকর্ড হারিয়ে ক্লোসা বললেন, ‘আগেই বলেছি, মেসি সর্বকালের সেরা’

১৬

ফরিদপুরে বাসের ধাক্কায় ইউপি সচিব নিহত, অল্পের জন্য রক্ষা ৪০ যাত্রীর

১৭

কে হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী

১৮

পদত্যাগ করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

১৯

চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী

২০