Ritesh Beghi
১৬ জুন ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

স্কোরলাইন বলছে ড্র, ইরানের গল্প বলছে অন্য কিছু

ড্র মানে নিষ্ফলা ম্যাচ। ড্র মানে কেউ জেতেনি, কেউ হারেনি। ‘নিষ্ফলা’? বললেই হলো?

একটু রিওয়াইন্ড করা যাক তাহলে। ৬৩তম মিনিট। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়াম। স্কোরবোর্ডে নিউজিল্যান্ড ২, ইরান ১। মাত্র আধঘণ্টা বাকি। অল হোয়াইটসরা তখন বিশ্বকাপের প্রথম জয় থেকে ত্রিশ মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে। যেন এত বছরের অপেক্ষার পর দরজার হাতল ধরে আছে, শুধু একটু ঘোরালেই নতুন এক দুয়ার খুলে যাবে ওশেনিয়ার রাজাদের সামনে।

সেই মুহূর্তে রামিন রেজাইয়ান বল পেলেন। ক্রস করলেন। সেটাকে শুধু ক্রস বললে ভুলই হবে। এই ক্রসে কি সোফি স্টেডিয়ামে হাজির আনুমানিক ৫০ হাজার ইরানিয়ান দর্শকের হৃৎস্পন্দনও আটকে ছিল না?

পরের গল্পটা আপনি জানেন, তার ক্রস ভেসে গেল বক্সের ভেতর, মোহামেদ মুহিবির মাথা ছুঁয়ে বল গেল বারপোস্টে, সেখান থেকে জালে। আটকে থাকা হৃৎস্পন্দন যেন আগলছাড়া হলো, গ্যালারি ফেটে পড়ল তীব্র উল্লাসে।

কিন্তু এই গ্যালারির গল্পটা একটু জানা চাই আপনার। খেলাটা হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইরানি ডায়াস্পোরার শহর। যারা দেশ ছেড়েছেন, যারা পারেননি, যারা চাননি… তারা অথবা দ্বিতীয় প্রজন্মের ইরানি আমেরিকানদের একটা বড় অংশ আজ এসেছিলেন এই সোফি স্টেডিয়ামে।

কাগজে-কলমে ইরান ছিল ‘হোম টিম’। কিন্তু সেই ‘কাগজে-কলমে’ কথাটা মুছে দিয়েছিলেন গ্যালারির ‘খেলোয়াড়রাই’। গ্যালারির সমর্থকদেরকে ফুটবলে বলা হয় দ্বাদশ খেলোয়াড়। সে কথাটাকে সার্থক করে তুলতে প্রতি মিনিটে যেন জান-প্রাণ দিয়ে দিচ্ছিলেন গ্যালারিতে হাজির ইরানিরা। এটা কি লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি নাকি তেহরানের আজাদি স্টেডিয়াম, তা নিয়ে খনিকের জন্য দ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিল না!

সেই গ্যালারিকে যেন আরও আপন করে তুলল একটা ঘটনা। ৭৯’র বিপ্লবের মতো হয়তো নয়, তবু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাহজারেহ তাইয়েবেহ স্কুলে হামলা, আর তাতে ঝরে পরা ১৬৮টি কোমল প্রাণ এখন ইরানিদের জাতীয় আবেগের একটা বড় অংশ হয়ে গেছে। সে আবেগের দেখা মিলল যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। সেখানে চোখে পড়ল একটা ব্যানার, যাতে লেখা ছিল: মিনাব ১৬৮।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্পিকার বাঘের গালিবাফ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি… তাদের সবাই এখন যে কোনো বৈঠকে যখন যান, তাদের কোটের কলারে শোভা পায় একটি ব্রোচ, যাতে লেখা থাকে মিনাব ১৬৮। সে ব্রোচ শোভা পেয়েছিল ইরানি খেলোয়াড়দের স্যুটে শোভা পেয়েছিল বিশ্বকাপে আসার সময়ও। আজ গ্যালারিতেও দেখা মিলল তার।

গোল আর পয়েন্টের খেলা তাতে আর নেহায়েতই সেসবে আটকে রইল না। ইরান সেই ম্যাচে হাসি মুখে, মাথা উঁচিয়েই মাঠ ছেড়েছে।

অথচ শুরুটা হয়েছিল উল্টোভাবে।

মাত্র ৫ মিনিটে এলিজাহ জাস্ট গোল করলেন। নিউজিল্যান্ড ১-০ এগিয়ে গিয়েছিল ধারার বিপরীতে। শুরুর চার মিনিটে তিন আক্রমণ করে ইরান জানান দিচ্ছিল তারাই নিয়ন্ত্রণে, তারপরেই এই চমকটা। আজাদি, থুড়ি সোফি স্টেডিয়ামের গ্যালারির সেই কোলাহল থমকে গিয়েছিল মুহূর্তেই।

ইরানকে আপনি কখনো শুরুতে আক্রমণ করতে দেখবেন না। না, খেলার মাঠে নয়, বলছি আসল যুদ্ধের ময়দানের কথা। এই তো ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন আক্রান্ত হলো, তার জবাবটাও ইরান দিয়েছিল কিছু পরেই।

মাঠের খেলাতেও তার ছাপ রইল। সে ধাক্কা সামলে নিয়ে কিছু পর প্রতি আক্রমণ থেকে মেহদি তারেমির শট যখন প্রতিহত হলো বারপোস্টে, তখনই মনে হচ্ছিল, গোল আসছে। সেটা এলোও। ৩২তম মিনিটে মোগানলুর ডিফ্লেক্টেড শট পেলেন রামিন রেজাইয়ান, তার চেষ্টাটা খুঁজে পেল জালের ঠিকানা, সমতা!

দ্বিতীয়ার্ধে ৫৫ মিনিটে ইরানকে আবারও ভড়কে দিয়েছিলেন সেই জাস্ট। ক্রিস উডের সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া করে বক্সে ঢুকে গোল। ২-১।

ফুটবল মাঠের ইরানকে আপনি না-ই চিনতে পারেন, কিন্তু রাজনীতির মাঠের ইরানকে তো আপনি চেনেন! যে ইরান কখনো হাল ছাড়ে না, পরাশক্তিদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলে, সেই ইরান খেলার মাঠে রণে ভঙ্গ দেয় কী করে?

ইরান রণে ভঙ্গ দেয়নি। ৫৭ মিনিটে গোলমুখে দুটো শট এল; নিউজিল্যান্ড গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রোকোম্ব দাঁড়িয়ে রইলেন দেওয়াল তুলে। তবে ৬৩ মিনিটে রামিন রেজাইয়ানের ক্রসে মুহিবির হেড এল, তাতেই সে দেয়াল ভেঙে ছত্রখান; বারপোস্টে লেগে জালে জড়াল বল, ২-২ হলো স্কোরলাইন।

এরপর আর গোল হয়নি। কিন্তু গ্যালারির শব্দ থামেনি। শেষ বাঁশির পর তা জোরালো হয়েছে আরও।

কিন্তু এই ড্র কি আসলে ড্র? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে কিছুদিন আগেই, ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতাও দেখা দিয়েছিল ইরানিদের, এরপর বেস ক্যাম্প সরিয়ে মেক্সিকোতে নিয়ে যেতে হয়েছে। ‘অরাজনৈতিক’ খেলা যত রকম ভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে, তা হয়েছে এই ইরানের সঙ্গে। সেসব একপাশে রেখে সেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যখন খেলতে নেমেছে ইরান, তখন মাঠে পড়েছে পিছিয়ে। তবে হাল ছাড়েনি, ঠিক নিজেদের জাতির গল্পটাই নতুন করে বলেছে ইরান। এই ড্র তাই ইরানের জন্য শুধু ড্র নয়, তার চেয়েও বেশি কিছুই।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ধর্ম নয়, সবার বড় পরিচয় বাংলাদেশি : তারেক রহমান

১

অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে দুই বছর লাগবে : অর্থমন্ত্রী

২

চলতি মাসেই বাড়তি বেতন পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

৩

আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

৪

ইরান যুদ্ধে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ স্বীকার জেডি ভ্যান্সের

৫

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বংসী দাবানল, পুড়ল শত শত একর জমি

৬

প্রশাসনে বড় রদবদল: সাত সচিবের দপ্তর বদল

৭

পুলিশ প্রশাসনে রদবদল: ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি

৮

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বন্দরে ‘বাংলাদেশ সনাতন সংঘ’র গীতা দান

৯

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১০

ইউরিয়া সার কারখানা স্কুল এন্ড কলেজের পুনর্মিলনী-২০২৬: অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু

১১

বিরোধীরা না থাকলেও বাস্তবায়িত হবে ‘জুলাই সনদ’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ : হাসনাত আবদুল্লাহ

১৩

এখন কেমন আছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যা জানালেন সফরসঙ্গী

১৪

ইতালিতে কর্মী নিতে ঢাকায় বিশেষ আয়োজন, কবে— সরকারকে জানালেন রাষ্ট্রদূত

১৫

ইসরাইলের সহায়তার প্রস্তাবে যা জানালেন সৌদি যুবরাজ

১৬

বিরোধী দলের নেতাদের চায়ের আমন্ত্রণ রাহুল গান্ধীর

১৭

বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চায় বাংলাদেশ

১৮

ইউনূসকে হেনস্তার সম্পূর্ণ দায় শেখ হাসিনার : জামায়াত আমির

১৯

নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা, পরে মিলল মৃত্যুর খবর—কাশ্মীরে হাহাকার

২০