পেঁয়াজের দামে দেশে ক্রেতার চোখে পানি, ভারতে কাঁদছে বিক্রেতা
- আপডেট সময় : ১২:০২:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
- / 4
দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমূখী রয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। এতে বাজারে গিয়ে ফুঁসে উঠছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। কেউ কেউ সরকারের নীতি সিদ্ধান্তকে দায়ী করে কটুক্তি করতেও পিঁছু হাটছেন না। অথচ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পেঁয়াজের ব্যাপক দরপতন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা তাদের সরকারি নীতিকে দুষছেন।
এদিকে বাংলাদেশে পেঁয়াজে সংকট নেই বলে জানাচ্ছে সরকার। অথচ দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সংকট থাকায় দাম কমছে না। একপর্যায়ে ভারতের পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা এলেও শেষ পর্যন্ত আমদানির অনুমোদন মেলেনি। এতে খুচরা বাজারে মাসের অধিক সময় ধরে শতক ছাড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে রান্না ঘরের অতীব জরুরি এই পণ্যটি।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শনিবার সকালে খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। গত সপ্তাহেও এই দামে পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা যায়। বাজারে তিন ধরনের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। ছোট সাইজের প্রতিকেজি পেঁয়াজ ১০০ টাকা, মাঝারি সাইজ ১১০ টাকা এবং এবং বড় সাইজের পেঁয়াজ ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দাম তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থির রয়েছে।
মুগদা বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন বলেন, ‘বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে কয়ডা টাহা (টাকা) পাই। তা দিয়ে দুইডা ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলতে হয়। তার উপর দুইদিন পরপর এক একটা সবজির দাম অনেক বাইড়া যায়। সরকারে যে-ই আসে আমাদের কথা তারা ভুলে যায়। দাম বাড়লে বড়লোকের তো অসুবিধে হয় না। পেটে লাথি পড়ে তো আমাদের।’
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল। যা দেশটির মোট রপ্তানির ৪২ শতাংশ ছিল। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে
ভারতে পেঁয়াজের বাজার কেমন
জানা গেছে, ভারতের স্থানীয় বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। এই দাম বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ কম। দেশটি থেকে বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ ব্যাপক বেড়ে গেছে। এতে স্থানীয় বাজারেও পেঁয়াজের দাম তলানিতে নেমেছে।
বাংলাদেশ এখন স্থানীয় কৃষকদের রক্ষায় ভারত থেকে পেঁয়াজ কিনছে না। ফলে দেশটির প্রধান পেঁয়াজ রপ্তানির বাজার নষ্ট হয়ে গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল। যা দেশটির মোট রপ্তানির ৪২ শতাংশ ছিল। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন পেঁয়াজ কিনেছে।
যদিও এরজন্য দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ‘রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে না থাকায় তাদের ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে নিয়েছে।’
বাংলাদেশে কেন পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমূখী
পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ দৃশ্যমান। প্রথমত, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। দ্বিতীয়ত, পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাব। তৃতীয়ত, মৌসুমের শেষ পর্যায় এবং চতুর্থত, বৃষ্টিতে পেঁয়াজের ক্ষতি হওয়া। সাধারণত, প্রতিবছরে নির্দিষ্ট কোনো এক সময়ে এই কারণগুলোর জন্য পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী দেখা যায়। এ বছর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি বন্ধ থাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবছর মৌসুম শেষের দিকে এসে পেঁয়াজের দামে বড় উল্লোফন দেখা যায়। বিশেষ করে অক্টোবর-ডিসেম্বরে বাজারে পেঁয়াজের সংকট দেখা যায়। নতুন পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজারে না আসা পর্যন্ত অস্থিরতা চলমান থাকে। এই সংকট ব্যবসায়ীরাই কৃত্রিমভাবে তৈরি করেন অনেক ক্ষেত্রে। সরকারের উচিত বছরের শেষ সময়কে টার্গেট করে স্থায়ী একটা সমাধান খোঁজা।

সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে
গত বুধবার (২৬ নভেম্বর) কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এক ব্রিফিংয়ে বলেন, বাজারে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই। কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী পেঁয়াজ আমাদনির জন্য আমাদের ওপর অনেক চাপ প্রয়োগ করেছে। তারা কোর্টেও গেছেন, যাতে আমরা পেঁয়াজ আমদানি করি। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কৃষকদের কথা চিন্তা করে পেয়াজ আমদানি করতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পেঁয়াজের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছে, সেটি গ্রীস্মকালীন। ওই পেঁয়াজটা বাজারে আসতে শুরু করেছে। আবার মুড়িকাটা পেঁয়াজটাও আসা শুরু হয়েছে। এ জন্য পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
কৃষি উপদেষ্ট আরও বলেন, আমদানি করলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকরা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিন্তু তারা চাষের দিকে আর যাবে না। এ জন্য আমাদের সবসময় কৃষকদের দিকে তাকাতে হবে।


























