Ritesh Beghi
১ অগাস্ট ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভারতে নেওয়ার আগে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও টিএফআই সেলে রাখা হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর

র‍্যাব-১ কার্যালয়ের গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়ে র‍্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।

আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এই বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এতদিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হলেও বিচারকদের শুধু নথি বা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থল সরেজমিনে দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে লিপিবদ্ধ হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।

পরিদর্শনে ভবনের ভেতরে মোট ২২টি ছোট-বড় কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে অনেককে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেকে রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফিরে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে মিলিয়ে আয়নাঘরের কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, তদন্তকারীরা সেটিও শনাক্ত করেছেন। একইভাবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে র‍্যাব-১ এর এই স্থাপনায় একটি কক্ষে আটকে রাখার এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, র‍্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর এবার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র, জেআইসি, পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।

আইনগত বিষয় তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং গ্রেফতারের কারণ জানাতে হয়। একই বাধ্যবাধকতা রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। কিন্তু আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগগুলো শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অভিযোগে ইতিমধ্যে বিচার চলছে এবং আরও অনেক ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার চেষ্টার আলামতও দেখা গেছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

তিনি বলেন, তদন্তের শুরুতে ঘটনাস্থলের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে কয়েকটি স্থানে নতুন করে নির্মিত দেয়াল অপসারণ করা হয়। তখনই আড়ালে থাকা কক্ষগুলো বেরিয়ে আসে এবং সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতির বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ভবনের নিচতলায় একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিচে ও ওপরে মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় কোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, তার জবাব সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদেরই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, পরবর্তীকালে দেয়াল তুলে বা নতুন নির্মাণের মাধ্যমে যারা এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার চেষ্টা করেছেন, তারাও বিচারের বাইরে থাকবেন না। প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনায় প্রসিকিউশন অঙ্গীকারবদ্ধ। তার দাবি, আয়নাঘরের বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে এটি কোনো ‘রূপকথার গল্প’ নয়, বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মাঠপর্যায়ে যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে এসব হয়েছে এবং সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাম উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৮৪০

দুই মেট্রো স্টেশনে বোমা আতঙ্ক, বস্তায় পাওয়া গেল জর্দার কৌটা-পান

তীব্র হচ্ছে এল নিনো, চরম তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরার সতর্কবার্তা দিল জাতিসংঘ

ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত অন্তত ৯

ভারতে নেওয়ার আগে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও টিএফআই সেলে রাখা হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর

‘জৈন্তাপুরে পাটওয়ারীর গাড়িবহরকে কড়া নিরাপত্তায় সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়’ — হামলার দাবি নাকচ ওসির

‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে মেজর জাহিদকে হত্যা, স্ত্রী-সন্তানকে গুমের অভিযোগ

ট্রাম্পের ১৫ দফার রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে ‘বোর্ড অব পিস’

বগুড়ায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪

র‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনালের বিচারক-প্রসিকিউশন

১০

বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরছে, বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১১

গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম

১২

বিশ্বকাপ স্বত্ব বিক্রি থেকে পিছু হটলেন ফিফা সভাপতি

১৩

অনুষ্ঠান শেষে একা ঘুরছিল ২ বছরের শিশু, পরিবারকে খুঁজছে পুলিশ

১৪

বেগুনের কেজি ১৫০ আর ৪০০ ছুঁই ছুঁই কাঁচা মরিচ

১৫

সিলেটে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতে হামলার দাবি, অস্বীকার পুলিশের

১৬

আনোয়ারায় চারতলা থেকে পড়ে তিন বছরের শিশুর মৃত্যু

১৭

এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

১৮

বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনলেন বিরাট-আনুশকা, কী আছে এতে

১৯

ফিফার নতুন পদক্ষেপ, বিপাকে আর্জেন্টিনা

২০