Ritesh Beghi
৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন কি বাড়ছে?

বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ তুলেছে ঢাকা। গত ৫ অগাস্টের ওই সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যেতে পারে কিনা- এসব প্রশ্ন এখন উঠছে। খবর বিবিসি বাংলার।

প্রায় দেড় হাজার মানুষ হত্যা এবং অসংখ্য মানুষকে স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার পরও তার মধ্যে নেই ন্যুনতম অনুশোচনা। কথায় সেই আগের মতোই অহংবোধ।

প্রতিবেশী দেশের আশ্রয়ে থেকে হাসিনার এমন দেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবারই প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সরকারকে অনুরোধও জানিয়েছে, যেন পতিত স্বৈরাচারকে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্য থেকে বিরত রাখা হয়। এও বলা হয়েছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে দেওয়া হাসিনার অডিও বক্তব্যের আগেও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ভারত হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেবে না, এমন প্রত্যাশার কথা জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদও।

কিন্তু বরাবরের মতোই থোড়াই কেয়ার ভারত। পূর্বের ঘোষণা মতো ৫ আগস্ট ঠিকই ভারতে বসে কনফারেন্স করেন পতিত শেখ হাসিনা। সেখানে অডিও বার্তাও দেন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, হাসিনা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কি বাড়ছে? প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যতই বা কী?

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের পতনের পর গঠিত অর্ন্তবতী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লি, দু’পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়।

তবে এরই মধ্যে গত ৫ অগাস্ট ভারতে আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সেদিন দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। কথা বলেন শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল। যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও।

ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা। হাসিনা গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সেই বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।

দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানান হয়েছিল। এর পরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে। একইসঙ্গে সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদের অনেকেও ভারত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।

তারা বলছেন, তাদের সরকার আসলে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড বন্ধ চায়। তবে পরিস্থিতিটাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন সাবেক কূটনীতিকরা।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের এই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা ছিল, সেটি আর অনুকূল ভূমিকা পালন করছে না।

আরেকজন সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, ‘এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, কিন্তু এটি অপ্রয়োজনীয় একটি প্রতিক্রিয়া, এটি দেখানো ঠিক হয়নি।’

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এ ঘটনাকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়। বিভিন্ন সময়ে হাসিনাকে প্রত্যপর্ণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অনুরোধও জানানো হয়।

জুলাইয়ের আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বা ফেরাতে ভারত সরকারকে ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়ে সেসময়ও অনুরোধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তখন ভারত ইতিবাচক কোনো জবাব দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক একেবারেই তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল বলে সেসময় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা দেখা যায়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপির রাজনৈতিক সরকারের শুরুতেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লা দেশটির প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তারও আগে গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পরে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লী সফর করেছিলেন।

তবে ভারতে থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় দিল্লিকে অনুরোধ জানানো হয় বলে ঢাকায় কর্মকর্তারা বলছেন। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, হাসিনার প্রত্যার্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।

এরই মাঝে নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা এখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অভিযোগ, এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের সমর্থন ছিল। ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা তৈরি করছে, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে ঢাকা।

এর ব্যাখ্যায় কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের আগেই বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা ভারতকে জানান হয়েছিল। এরপরও সেই সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানান হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এমন একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।’

এদিকে বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক ইস্যু আছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অনেক ইস্যু আছে। যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে, ডায়লগের মাধ্যমে, বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমরা অবশ্যই বসতে চাই, তবে সিদ্ধান্তটা ভারতকে এখন নিতে হবে।’

অন্যদিকে সাবেক কূটনৈতিক ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সম্পর্ক উন্নয়নের যে ধারণা বা প্রচেষ্টাটা ছিল, এই ধরনের ঘটনা সেটার জন্য অনুকূল বা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুষ্ঠানের বক্তব্যকেও সমর্থন করে না তারা।

কিন্তু সেই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভারতের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না বা তারা এর সঙ্গে যুক্ত নয় বা তারা এই মতের সঙ্গে একমত নয়, এই কথাগুলো সত্যিকার অর্থেই কোনো অর্থ বহন করে না।’

হুমায়ুন কবির মনে করেন, সরকার যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতের প্রতিফলনটা এসেছে।

যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় দু’পক্ষেরই সদিচ্ছা দেখানো উচিত। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন ভারতের দিক থেকেই ভূমিকা প্রয়োজন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অস্ত্র হস্তান্তরসহ শান্তি পরিকল্পনার পরের ধাপে যেতে প্রস্তুত হামাস

সোমবার এসএসসি-সমমানের ফল, জানা যাবে যেভাবে

হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন কি বাড়ছে?

‘মক্কা চুক্তি’ ইরানের বিরুদ্ধে নয়, জানাল তুরস্ক

কক্সবাজারে যেসব কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী

সালমান শাহ হত্যা মামলার রাজসাক্ষীর বক্তব্যের পালটা জবাব দিলেন শাবনূর

পেশা নিয়ে অপপ্রচার, আওয়ামী কর্মীদের উদ্দেশ্যে যে বার্তা দিলেন তাসনিম জারা

গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ লাশ উদ্ধার, বেশিরভাগ নারী-শিশু

ব্রাজিলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ৪

মানবসেবার জন্য রোটারির সম্মানজনক পদক পেলেন ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

১০

হাসিনার নির্দেশে গুম করা হয়েছিল সালাহউদ্দিন আহমদকে

১১

সময়মতো না আসায় ফ্লাইট মিস, দৌড়ে গিয়ে প্লেন থামাতে গেলেন দুই নারী (ভিডিও)

১২

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে আসছে ‘নেচার ব্লিডস্’

১৩

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ সোমবার সকাল ১০টায়, যেভাবে জানা যাবে

১৪

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে

১৫

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা, ঋণের সুদ মওকুফ চায় চট্টগ্রাম চেম্বার

১৬

ভারত-চীনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিল পাস যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে

১৭

২০৩০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন এই ১০ তরুণ

১৮

মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

১৯

ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল, সীমিত হয়ে পড়েছে সামরিক বিকল্প

২০