
নিজস্ব প্রতিবেদক: দক্ষিণ এশিয়ার গড়কে পেছনে ফেলে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের বোঝায় প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, দেশের মাথাপিছু বৈদেশিক দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪৬ ডলারে, যেখানে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মাথাপিছু গড় ঋণ ৫৬৪ ডলার।কূটনীতি শিখুন
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছে ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি ডলারে। এর ফলে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় মোট বকেয়া দেনা বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৭ কোটি ৫৭ লাখ (১৭৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন) জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই গড় মাথাপিছু ঋণের হিসাব করা হয়েছে, যা মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক দায় নির্দেশ করে। গত এক দশকে দেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; ২০১৫ সালে যার অঙ্ক ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল ও মালদ্বীপের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৯৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং মোট জনসংখ্যা ১ দশমিক ৬৯২ বিলিয়ন। আঞ্চলিকভাবে এই ঋণ মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ২১ শতাংশের সমপরিমাণ এবং রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ঋণ পরিশোধে। এসব দেশের মধ্যে ভারতের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৫২২ ডলার এবং নেপালের ৪০১ ডলার, যা বাংলাদেশের চেয়ে কম। অন্যদিকে আঞ্চলিক অন্য তালিকায় থাকা পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণ ১৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং ২৫ কোটি ৫২ লাখ জনসংখ্যার ভিত্তিতে দেশটির মাথাপিছু দেনা প্রায় ৫২৯ ডলার। তবে অঞ্চলে মাথাপিছু ঋণে শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ (প্রায় ৮,৯৫৭ ডলার), ভুটান (৪,২১৮ ডলার) এবং শ্রীলঙ্কা (প্রায় ২,৬৪৫ ডলার)। সামগ্রিক ঋণ পরিমাণের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের দায় সর্বোচ্চ ৭৬৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, যার পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। তালিকায় শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণ ৫৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার এবং আফগানিস্তানের দেনা দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে।বাংলাদেশ সংবাদ
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি ও সরকারি নিশ্চয়তাযুক্ত দায় রয়েছে ৮৯ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের স্থিতি ১৪ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন এবং বেসরকারি খাতের নিশ্চয়তাহীন ঋণ ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। সরকারি ও সরকারি নিশ্চয়তাযুক্ত ঋণের বড় অংশই বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর, যার পরিমাণ ৫১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপাক্ষিক ঋণের স্থিতি ৩২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি ঋণদাতাদের পাওনা ৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) পাওনা ২২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ১৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থার। দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে একক দেশ হিসেবে জাপানের পাওনা সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার এবং রাশিয়ার পাওনা ৯ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতার পাওনা ১০ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশে উঠেছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ ও মোট জাতীয় আয়ের অনুপাত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে রপ্তানি আয় ও জাতীয় আয়ের বিপরীতে ঋণ পরিশোধের ব্যয় কিছুটা কমেছে। রপ্তানির বিপরীতে ঋণ পরিশোধের হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে এবং মোট জাতীয় আয়ের বিপরীতে এ হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে।
বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক ঋণ পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ ২০২৫ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে, যা ২০২১ সালের পর বার্ষিক সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এ সময়ে দেশগুলো আসল ও সুদ বাবদ মোট ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু জানান, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি ঋণের প্রবাহ বাড়লেও দেশগুলো ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকছে না। বিশেষ করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলোর বৈদেশিক দেনা ৮ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মন্তব্য করুন