রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর আজ। দেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসাবে বিবেচিত হয়। এ হামলায় বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে ইতালি, জাপান, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ছিলেন। এছাড়া হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাও প্রাণ হারান এবং অনেকে আহত হন। নৃশংস সেই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুটি ধাপ পেরিয়েছে। এ মামলায় বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্টে রায় হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন দণ্ডিত আসামিরা, যা আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় দেন। বিচারিক আদালতের রায়ে ‘নব্য জেএমবির’ সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে ৭ আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামি আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক লিভ টু আপিল করেন। জানা যায়, ‘ছয় আসামির ক্ষেত্রে লিভ টু আপিল করা হয়েছে। চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিলগুলো উপস্থাপন করা হবে।’
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন- রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। এদের মধ্যে আসলাম হোসেন গত বছরের ৬ জুন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যায়। তখন কারারক্ষীদের গুলিতে মোট ৬ জন নিহত হন।
জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ রানা মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামি আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক লিভ টু আপিল করেন। মামলাটি কার্যতালিকায় এলে শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আবেদন করা হবে।
এই মামলার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় গত বছরের ১৭ জুন। রায়ে প্রাসঙ্গিক বিবরণে বলা হয়, তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্ট এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা যায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা চালায়। সেই হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ সেনা কমান্ডো অভিযানে নিহত হন। তারা হলেন-রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যার পর গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। ইফতারের পর কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে। শুরু হয় জিম্মি সংকট। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এরপর র্যাব, সোয়াট, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।
প্রথম দফায় জিম্মিদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। পরে তারা মারা যান। আহত হন আরও অনেকে। রাতভর গুলশানের রাস্তায় অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা। কেউ জানতে পারছিলেন না, ভেতরে তাঁদের প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন কিনা।
পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে রেস্তোরাঁর দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে ঢোকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযান শেষ হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু তারপরই স্পষ্ট হয় হামলার ভয়াবহতা। রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ২০ জিম্মির লাশ। তাদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।
মন্তব্য করুন