Ritesh Beghi
১৩ জুলাই ২০২৬, ২:০২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ

স্টেডিয়ামে তখন হাজারো মানুষের গর্জন। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে। পৃথিবীর সব শব্দ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। ১২ গজ দূরে একটি বল। সামনে গোলপোস্ট। মাঝখানে একজন গোলকিপার আর বলের পেছনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপরই বদলে যেতে পারে একটি দেশের ইতিহাস। একজন ফুটবলারের জীবন। কোটি মানুষের স্মৃতি।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটি সেই ফুটবলার, যিনি পেনাল্টি মিস করেন। আবার কখনো সেই গোলকিপার, সবকিছু উজাড় করে দিয়েও শেষ বলটি ঠেকাতে পারেন না। শেষ বাঁশির পর সবাই কারও না কারও কাছে ফিরে যান। কেউ সতীর্থদের সঙ্গে বিজয় উদ্‌যাপন করেন, কেউ পরিবারের বুকে আশ্রয় খুঁজে পান। কিন্তু এই মানুষটি অনেক সময় নিজের কাছেও ফিরতে পারেন না। তার চোখের সামনে বারবার ফিরে আসে একই দৃশ্য—একটি বল, একটি শট, একটি মুহূর্ত।

ফুটবলে সবচেয়ে দীর্ঘ পথটি হয়তো ১২ গজের। আর সবচেয়ে ভারি কয়েক সেকেন্ডও। চলতি বিশ্বকাপও সেই নির্মমতার নতুন সাক্ষী হয়েছে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষেও একই পরিণতি। একই বিশ্বকাপে দুটি পেনাল্টি মিস করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।

অথচ মেসিই পরে দলকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছেন, গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন। কয়েক সেকেন্ডের একটি ব্যর্থতা কোনো কিংবদন্তিকে ছোট করে না, সেই মুহূর্তের নিঃসঙ্গতা তার ভেতরে অনেক দিন বেঁচে থাকে।

নকআউট পর্বেও পেনাল্টির নিষ্ঠুরতা ছাড়েনি বিশ্বকাপকে। টাইব্রেকারে বিদায় নিয়েছে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। একই ১২ গজ কাউকে বানিয়েছে নায়ক, কাউকে পরিণত করেছে ট্র্যাজিক চরিত্রে। একজন গোলরক্ষক একটি শট ঠেকিয়ে জাতীয় বীর হয়েছেন, অন্য প্রান্তে একজন ফুটবলার মাথা নিচু করে হেঁটে গেছেন ড্রেসিংরুমের দিকে। সবচেয়ে ছোট দূরত্বও কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা হয়ে ওঠে।

একটি পেনাল্টির আগে সময় যেন ধীরে চলতে শুরু করে। স্টেডিয়ামের গর্জনও তখন কেমন দূরে সরে যায়। বলটি মাটিতে রাখা হয়। ফুটবলারটি কয়েক পা পেছনে যান। গোলকিপার দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই মুহূর্তে দুজন মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ। একজন জানেন, গোল করতে না পারলে কোটি মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। আরেকজন জানেন, বলটি ঠেকাতে না পারলে তিনিও হারবেন ইতিহাসের কাছে। বাকি ২০ জন ফুটবলার, হাজারো দর্শক, কোটি কোটি সমর্থক শুধু অপেক্ষা করেন। কয়েক সেকেন্ডের সেই নীরবতা কখনো কখনো পুরো ক্যারিয়ারের চেয়েও দীর্ঘ হয়ে ওঠে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস এমন অসংখ্য মানুষের কান্নায় ভরা। ১৯৯৪ সালে রবার্তো বাজ্জিওর পেনাল্টি আকাশে উড়ে গিয়েছিল। সেই ছবিতে ছিল ভেঙে পড়া একটি জাতির মুখ। ২০২২ সালে হ্যারি কেইনের দ্বিতীয় পেনাল্টি গোলবারের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারেননি।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পর নেইমারের চোখের জল পুরো ব্রাজিলের কান্নায় পরিণত হয়েছিল। বিশ্বকাপ বারবার এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।

বিশ্বকাপ এমনই। এখানে একটি পেনাল্টি একজন ফুটবলারের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। বহু বছর পরও মানুষ তার শত গোল ভুলে যায়, মনে রাখে সেই একটি মিস। ইতিহাস কখনো কখনো বড় নিষ্ঠুর। সে পুরো ক্যারিয়ারকে গুটিয়ে এনে একটি মুহূর্তে আটকে দেয়। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, সেই মানুষটিও একজন ছেলে। একজন বাবা। একজন স্বামী। একজন সন্তানের সন্তান।

ম্যাচ শেষে যখন পুরো পৃথিবী তার ভুল নিয়ে আলোচনা করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন তিনিও ফোন করেন নিজের মাকে। পরিবারের মানুষ তাকে বলেন, ‘তুমি চেষ্টা করেছ।’ পৃথিবী শুধু ফলাফলটাই মনে রাখে।

সবচেয়ে কঠিন সময়টি শুরু হয় ম্যাচ শেষ হওয়ার পর। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে ঘুরে ফিরে আসে সেই একটি মিস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মন্তব্য। সমালোচনা, বিদ্রুপ, হতাশা—সবকিছু এসে জমা হয় একজন মানুষের কাঁধে। যে ফুটবলারটি কয়েক দিন আগেও ছিলেন জাতীয় নায়ক, তিনি এক রাতেই অনেকের চোখে খলনায়ক হয়ে যান। অথচ তার বুকের ভেতরেও রক্তক্ষরণ হয়। তিনিও সারারাত ঘুমাতে পারেন না। চোখ বন্ধ করলেই ফিরে আসে সেই বল, সেই দৌড়, সেই শট।

ড্রেসিংরুমে তখন অন্য রকম নীরবতা। কেউ বুট খুলছেন না। কেউ জার্সি বদলাচ্ছেন না। কেউ মাথা নিচু করে বসে আছেন। যে ফুটবলার পেনাল্টি মিস করেছেন হয়তো বারবার একই দৃশ্য কল্পনা করছেন—‘আরেকবার যদি সুযোগ পেতাম…’

সেই সুযোগ আর আসে না। বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডারে চার বছর খুব দ্রুত কেটে যায়। একজন ফুটবলারের জীবনে চার বছর অনেক দীর্ঘ। অনেকের জন্য সেই মিস করা পেনাল্টিই হয়ে যায় শেষ বিশ্বকাপের শেষ স্মৃতি।

যে খেলাটি একজন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দেয়, সেই খেলাটিই আবার তাকে উঠে দাঁড়াতে শেখায়। পরদিন সূর্য ওঠে। অনুশীলন শুরু হয়। আবার বল গড়ায়। আবার ১২ গজের সামনে দাঁড়াতে হয়।

যে মানুষটি আজ সবচেয়ে নিঃসঙ্গ, আগামীকাল তিনিই আবার অনুশীলনে নামেন। আবার ১২ গজের সামনে দাঁড়ান। আবার বলটি সাজিয়ে রাখেন। বিশ্বকাপ প্রতি চার বছর পরপর নতুন নায়ক খুঁজে পায়। নতুন চ্যাম্পিয়নও পায়। প্রতিটি বিশ্বকাপ শেষ হলে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ চুপচাপ বসে থাকেন। তার চোখের সামনে বারবার ফিরে আসে সেই একটি শট। সেই একটি সেভ। সেই একটি মুহূর্ত।

পৃথিবী ট্রফি মনে রাখে। ইতিহাস চ্যাম্পিয়নের নাম লিখে রাখে। ফুটবলের সবচেয়ে গভীর নীরবতা লুকিয়ে থাকে সেই মানুষটির বুকের ভেতর। ‘বলটা যদি আরেকটু নিচে যেত…’

‘শটটা যদি আরেকটু জোরে নিতে পারতাম…’

‘আরেকবার যদি সুযোগ পেতাম…’

সেই সুযোগ আর আসে না। যার ভুলে একটি দেশ কেঁদেছিল। আর যিনি সারাজীবন নিজেকেই ক্ষমা করতে পারেননি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রাথমিকের সব বই সরবরাহের নির্দেশ

১

১৫ দিনের মধ্যে অবৈধ চুনাকারখানা বন্ধ করতে হবে: এমপি মান্নান

২

চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতন নির্ধারণে ৮ নির্দেশনা

৩

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঙ্গলবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক তারেক রহমানের

৪

ধর্ম নয়, সবার বড় পরিচয় বাংলাদেশি : তারেক রহমান

৫

অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে দুই বছর লাগবে : অর্থমন্ত্রী

৬

চলতি মাসেই বাড়তি বেতন পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

৭

আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

৮

ইরান যুদ্ধে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ স্বীকার জেডি ভ্যান্সের

৯

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বংসী দাবানল, পুড়ল শত শত একর জমি

১০

প্রশাসনে বড় রদবদল: সাত সচিবের দপ্তর বদল

১১

পুলিশ প্রশাসনে রদবদল: ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি

১২

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বন্দরে ‘বাংলাদেশ সনাতন সংঘ’র গীতা দান

১৩

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১৪

ইউরিয়া সার কারখানা স্কুল এন্ড কলেজের পুনর্মিলনী-২০২৬: অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু

১৫

বিরোধীরা না থাকলেও বাস্তবায়িত হবে ‘জুলাই সনদ’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ : হাসনাত আবদুল্লাহ

১৭

এখন কেমন আছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যা জানালেন সফরসঙ্গী

১৮

ইতালিতে কর্মী নিতে ঢাকায় বিশেষ আয়োজন, কবে— সরকারকে জানালেন রাষ্ট্রদূত

১৯

ইসরাইলের সহায়তার প্রস্তাবে যা জানালেন সৌদি যুবরাজ

২০